তুমি রবে নীরবে…

Spread the love

মো: জিয়াউল হক: পৃথিবীতে সবাইকে ভালোবাসা যায় না আবার যাকে ভালোবাসা যায় তার দূরত্ব সহ্য করা যায় না। কিছু কিছু মানুষ চলে যাবার পরেও চলে যেতে অনেক সময় নেয়। আবার কিছু মানুষ আরেকটু বেশি ত্যাদোড় টাইপের হয় নিজে চলে গেলেও ছায়াটুকু কখন যেন পেছনে ফেলে যায় টেরই পাওয়া যায়না বাস্তবতার কড়া রোদে পুড়ে কখনোইই তা পুরোপুরি মুছে যায়না। সময় অসময়ে, রাতে বিরাতে মনের দরজায় এসে খট খট করে শুধু।  

প্রিয় বন্ধুকে হারিয়ে মন কাঁদছে আমার। বুকের ভিতরে চলছে রক্তক্ষরণ। আমাদের অগণিত স্মৃতি থাকলেও না বলা অনেক কথাই জমা ছিলো। কিন্তু আমাদের সব ভালোবাসা উপেক্ষা করে গত ২৯ সেপ্টেম্বর আমার বন্ধু ইসরাফিল হোসেন মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।

শেরপুরের নকলা উপজেলার কায়দা গ্রামের এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া আমার বন্ধু মো: ইসরাফিল হোসেন পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতে তার রয়েছে গৌরবময় স্মৃতি। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, ১৫ ফেব্রুয়ারী অবৈধ নির্বাচন খালেদা জিয়ার পতনের আন্দোলনসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ইসরাফিলে সাহসী ভূমিকা আমাকে সবসময়ই ঈর্ষান্বিত্ব করে।

শৈশবে বাবাকে হারানো পরিবারের ছোট ছেলের পক্ষে সমাজবদলের সংগ্রামের চেয়ে জীবন-জীবিকার লড়াইটা যে অনেক জরুরি, সেই বাস্তব বোধবুদ্ধি তাঁর ছিল। ঢাকায় গিয়ে চাকরি করেছেন, চাকরি বদলও করেছেন, কিন্তু জীবন যুদ্ধের সব পরীক্ষায় সফল হতে পারেনি। তবে সে হতাশ হয়ে দমে যায়নি। ঢাকা থেকে স্ত্রীকে নিয়ে নকলায় চলে এসেছেন। বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে অভাবের সংসারটা সামাল দিয়েছেন। অবশেষে ভাগ্য প্রসন্ন হয়েছিল। কয়েক বছর আগে ৪ বন্ধু মিলে ঠিকাদারী ফার্ম গঠন করেন, ব্যবসায় ঢুকে মোটামুটি সাফল্য পেয়েছিল ইসরাফিল। ২ মেয়ে কে নিয়ে সুখের সংসারে দিন কাটাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কষ্টের দিনগুলো বোধ হয় শেষ হয়েছে। কিন্তু সবার ভাগ্যে সুখ সহ্য হয়না। তাই কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার বন্ধু আমাকে ছেড়ে চলে গেল যেখানে গেলে কেউ ফেরে না।

ধর্মপরায়ণ ইসরাফিল নিজ উদ্যোগে বাড়ীর পাশে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে তাঁর পার্টনারের সঙ্গে ব্যবসায়ী হিসাব নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ২ বছরের অধিক সময় ধরে কোন হিসাব দিতে পারেনি তার ২ ব্যবসায়ীত পার্টনার মো: রফিকুল ইসলাম এবং মো: সাইদুল ইসলাম। ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ টাকা  ছলচাতুরির হিসাবে গড়মিল করে নিজেদের করে নেয়। ওদের সাথে থেকেও তুই কেন চুরি ধরতে পারলিনা বলে আত্নীয়দের কথাগুলো তাতে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। দিন রাত না ঘুমিয়ে হিসাব কষতে থাকে আর টেনশন করতে থাকে মানুষের কাছে থেকে ধারদেনা করে আনা টাকা পরিশোধ করতে না পারলে মৃত্যু ছাড়া কোন মুক্তি নাই।

তার সে ভাবনাই সত্যি হলো। ইসরাফিল তুই এমন করে হঠাৎ চলে গেলি ভাবতেই কান্না আসে, তোর প্রতি ভালোবাসার অশ্রু ঝরছে। মৃত্যুর আগের রাতেও ফোনে আমাদের নানা বিষয়ে কথা হলো। নকলার রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে তার প্রখর বিচক্ষণতা ছিলো। কুশল বিনিময়ের পর দিন ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১১ টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিয়তির অমোঘ বিধান প্রিয়জনদের অশ্রুজলে ভাসিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলো।

ইসরাফিলের অকাল মৃত্যুর জন্য ষারা দায়ী তাদের বিচার দাবী করছি। মহান আল্লাহর তার পরিবারকেও শোক বহিবার ক্ষমতা দান করুক। আসলে বিদায় শব্দটি সব সময়ই মর্মস্পর্শী, দু: খ ভারাক্রান্ত, শ্বাসরুদ্ধকর কিন্তু বিদায় মানেই প্রস্থান নয়। আসলে বিদায় তো কেবল তাদের জন্য যারা শুধুমাত্র চোখ দিয়ে ভালোবাসে, যারা হৃদয় ও আত্না দিয়ে ভালোবাসে তাদের কাছে বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই।

(নকলা থেকে ফিরে বন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন আমাদের কণ্ঠ২৪ডটকমের সম্পাদক)

Related posts