ধর্ষণের মহোৎসবে বিচারহীনতার দায় কতটুকু?

Spread the love

মো. জিয়াউল হক: নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া এই ধরণের ঘটনা সম্ভব নয়। আমরা সবাই ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছি, সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ধর্ষকদের ফাঁসি চাচ্ছি। কিন্তু বর্তমান ঘটনাবলী হলো ভংগুর রাষ্ট্রব্যবস্থা নামক রোগের সিমটম যেখানে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার জেঁকে বসেছে।

বাংলাদেশে কোনো আইনের শাসন কেন? বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় দেশব্যাপী ধর্ষক গড়ে উঠছে। এ অবস্থায় আমরা যদি সোচ্চার না হই তাহলে এই সমস্ত ঘটনাবলী ঘটতেই থাকবে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে, সুশাসন নিশ্চিত না হলে এটাকে বন্ধ করা যাবে না।

কারণ, তারা রাজনীতি-পরিচয়কে অপরাধের অস্ত্র ও শাস্তি ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তারা জানে, পুলিশ, আইন, বিচার প্রভৃতি সবকিছুই তাদের ক্ষমতার কাছে নতজানু। তারা জানে যে এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার চোখ রাঙিয়ে সটকে পড়া যাবে। তাই তারা অনায়াসে নানা রকম অপরাধে যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছাড়ে না। বেপরোয়াপনা ও ‘মাসল পাওয়ার’ দেখানোর আরও নেপথ্য কারণ আছে। ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের ধর্ষণকাণ্ড লিখতে গেলে কয়েক খণ্ড গ্রন্থ রচিত হয়ে যাবে। ধর্ষণকাণ্ডের অধিকাংশই খবরে আসে না। ধর্ষণের শিকার নারীরা সাধারণত ভয়েই ঘটনা প্রকাশ করেন না। এসব সমস্যা ছাপিয়ে ছিটেফোঁটা যে দু-একটি খবর প্রকাশিত হয়, সেগুলোর কয়েকটি দিয়েই অপরাধীদের দায়মুক্ত থাকার নমুনা টের পাওয়া যায়।

আইন শৃংখলা ছাড়া যদি রাষ্ট্র চলতো তাহলে গত ৪০০ বছর ধরে এত রাষ্ট্র বিষয়ক নিয়মনীতির দরকার ছিল না আমরা স্বীকার করি বা না করি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়োর মত বিগত ঘটনাবলিতে তা প্রমাণিত। আমাদের এটা মনে রাখতে হবে ধর্ষণের সাথে ক্ষমতা সম্পৃক্ত।’

গত সাড়ে চার বছরে সাড়ে সাত হাজার নারী ধর্ষিত হয়েছে। গত চার মাসে ধর্ষিত হয়েছে ৮ শতাধিক নারী। ধর্ষণের বিচারে আইন ও তদন্ত ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিবাদে কোনো পরিবর্তন আসেনা, পরিবর্তন আসে প্রতিরোধে। কয়েক বছর আগে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছিল, নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলার শাস্তি হয় মাত্র ৩ ভাগের; বাকি ৯৭ ভাগ মামলার আসামিরা শাস্তির বাইরেই থেকে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক পরিবর্তন দরকার। যে জাতি তার মায়ের সম্ভ্রম, বোনের ইজ্জত রক্ষা করতে পারে না তাদের ধ্বংস অনিবার্য। যে সরকার ব্যাংকগুলো খালি করে বাড়ি বাড়ি ব্যাংক তৈরি করে তাদের জন্য ধর্ষণ সম্ভব। ক্ষমতা আর অর্থের অসম বন্টনের ফলে সমাজে দুই ধরনের মানুষ তৈরি হয়েছে। এক ধরনের মানুষ নিজকে আইনের উর্ধ্বে মনে করে। আরেক ধরনের বিকৃত মানুষ সৃষ্টি হয়েছে যারা কাউকে নির্যাতন করতে পারলে উল্লাসিত হন। এখন এটা মোকাবেলা করার জন্য সমাজের সকল তরফ থেকেই প্রচেষ্টা চালাতে হবে। রাজনৈতিক ভাবে, সামাজিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে, নৈতিকভাবে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগত অবস্থান থেকে এভাবে সকল অবস্থান থেকেই প্রতিরোধ করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো আজ ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের কল্যাণে তারা কোনো ভুমিকা রাখতে পারছে না। তাই আজ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের জাগিয়ে তুলতে হবে।’

বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক। নারীরাও তাদের সাফল্যগাথা তৈরি করে চলেছে। এই এগিয়ে চলার পথে যেন এক নিকষ কালো গহ্বর নারীর প্রতি সহিংসতা, যা আধুনিকতা, উন্নয়ন ও এগিয়ে চলাকে প্রতিনিয়ত কটাক্ষ করে চলেছে। জ্বলে ওঠা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আজ আমাদের সবাইকে জেগে উঠতে হবে। সারাদেশে ছাত্র-ছাত্রীরা আজ যে প্রতিবাদ জানাচ্ছে তাতে আমাদের সবাইকে একাত্মতা ঘোষণা করা দরকার। আজ আমিও চলমান প্রতিবাদ ।

‘এক সময় আমাদের দেশটা ছিল দারিদ্র সীমার নিচে। আর এখন সে দেশটা চলে গেছে চরিত্র সীমার নিচে, যা সত্যি দু:খজনক ও লজ্জাজনক। আমাদেরকে এখনই সোচ্চার হতে হবে কারণ, মিথ্যা তখনই জিতে যায়, সত্য কথা বলার মত লোকগুলো যখন চুপ হয়ে যায় অথবা চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়।

লেখক: প্রকাশক ও সম্পাদক, ডেইলি আমাদের কণ্ঠ২৪ ডট কম লিমিটেড

Related posts