শেরপুরে শেখ রাসেল বিশ্ববিদ্যালয় কেন প্রয়োজন!

Spread the love

সৌমিত্র শেখর: কোনো প্রতিযোগিতার তুলনা নয়, বুঝবার সুবিধার জন্য আমরা শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের দৃষ্টান্তই দিতে চাই: যে ময়মনসিংহ আর শেরপুর ছিল একদিন সমানতালে অগ্রবর্তী, সেই ময়মনসিংহে আজ একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ, একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, একটি প্রকৌশল কলেজ, দুটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, একটি ক্যাডেট কলেজ, একটি শিক্ষাবোর্ড। পক্ষান্তরে শেরপুরে এর একটিও নেই। শেরপুরের ছাত্রছাত্রীদের একটু উন্নত শিক্ষা নিতে হলেও যেতে হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অথবা মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হলে সেটিও জামালপুরে বা নেত্রকোণায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন (২৫ জুলাই, ২০১৫), প্রতিটি উপজেলায় সরকারি স্কুল এবং প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহের পাশাপাশি জামালপুরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোণায় শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং কিশোরগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য সংসদে বিল পাস হয়েছে। অথচ, জামালপুর, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ কোনো জেলার চেয়েই পশ্চাৎপদ নয় বা ছিল না শেরপুর জেলা।

বর্তমান প্রশাসনের সুদৃষ্টি পেলে শেরপুর আবার পাকিস্তানপূর্ব অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কারণে শেরপুর আজ পাঁচ জেলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মিলনস্থল। যেমন, শেরপুরের পূর্বদিকের ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট উপজেলা, পশ্চিমদিকের জামালপুর জেলার বকসিগঞ্জ উপজেলা এবং তার পাশের গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার অনেক মানুষ আজ শেরপুরের যে-কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে। উল্লিখিত অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতিসাধনের কারণে শেরপুরে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় তাহলে সেখানে ছাত্রছাত্রীর অভাবতো হবেই না বরং পাকিস্তান আমল থেকে প্রশাসনের বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশল্যকরণীর কাজ করবে। আমরা বিশ্বাস করি, এখানে উচ্চশিক্ষার একটি আলোক শিখা জ্বালালেই তার প্রভাব পড়বে শেরপুরের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজের নানাস্তরে। বর্তমান সরকার প্রান্ত থেকে উন্নয়ন কেন্দ্রমুখী নিয়ে যাওয়ার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, শেরপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সে উদ্যোগের উপাদান হিসেবে কাজ করবে।

শেরপুরে শেখ রাসেলের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি কেন, এই প্রশ্ন উঠতে পারে। শেখ রাসেল হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিষ্পাপ, মাসুম, পবিত্রতার প্রতীক। আর উচ্চশিক্ষাতো তাই, যা মানুষকে বিশুদ্ধজ্ঞানের মাধ্যমে পবিত্র করে তোলে? নিজের কোনো অংশগ্রহণ না-থাকার পরও যে মানবশিশুটিকে রাজনীতির যূপকাষ্ঠে জীবন দিতে হলো, সেই শেখ রাসেলকে নিয়ে সমাজ বা রাজনীতির কোথাও কোনো বিতর্ক নেই। সবাই তাকে নিষ্পাপ ফুলের সঙ্গেই তুলনা করেন। এই বিকর্তহীন শুভ্র চরিত্রের মানুষটির নামেইতো বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া যথাযথ। অথচ তার নামে দেশের কোথাও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেরপুরে একাধিকবার গেলেও মুক্তিযুদ্ধের মহান স্থপতি ও জাতির পিতা বা তার পরিবারের কারো নামেই শেরপুরে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। শেখ রাসেলের নামে শেরপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সে শুভ সূচনাও হতে পারে। আর একটি কথা, বঙ্গবন্ধু তার কনিষ্ঠপুত্রের নামকরণ করেছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের নামে। এই প্রখ্যাত দার্শনিকের নামটিও পরোক্ষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মরণীয় হবে নিশ্চয়।

অতএব, প্রতিজেলায় বিশ্ববিদ্যালয়- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ঘোষণা অনুসারেই বিভিন্ন আন্দোলন-বিদ্রোহের পীঠস্থান, ঐতিহাসিক ও সমৃদ্ধ শেরপুর জেলাতে অনতিবিলম্বে ‘শেখ রাসেল বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করা প্রয়োজন। আশাকরি, সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, শেখ রাসেল বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন গণকমিটি, ঢাকা।

Related posts